
মো: হাবিবুল্লাহ খান রাব্বী :
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২০ জুলাই বেলা ১১টায় কুয়াকাটা সিকদার রিসোর্টের হল রুমে পায়রা বন্দরের মাস্টার প্ল্যান সম্পর্কিত একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, সামরিক ও বেসামরিক সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, বন্দর ব্যবহারকারী-অংশীজন, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও নেদারল্যান্ডের রয়্যাল হাসকোনিং ডিএইচভি এর প্রতিনিধিগণ এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মাসুদ ইকবাল। তিনি ২০২৬ সালের জুলাই মাস হতে পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল অপারেশনাল করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার প্রস্তুতি ও সহযোগিতা আহবান করেন। এছাড়া ড্রেজিংসহ অত্যাবশ্যক কয়েকটি কাজ সম্পাদনে তিনি সরকারের সহায়তা কামনা করেন। অনুষ্ঠানে পায়রা বন্দরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের উপর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন বুয়েট টিমের লিড কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ।

এরপর পায়রা বন্দরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল হাসকোনিং ডিএইচডি এর টিম লিডার মেনো মুইজ (Mr. Menno Mooij) মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) কমডোর মোহাম্মদ আব্দুল কাদের পায়রা বন্দরের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং ভবিষৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। সেমিনারের দ্বিতীয় সেশনে বিভিন্ন অংশীজনের পক্ষ হতে মাস্টার প্ল্যান ও সামগ্রিকভাবে পায়রা বন্দরের অগ্রগতি বিষয়ক মন্তব্য ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, সাধারণ জ্ঞাতব্য বিষয় বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯৩% চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যার ফলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। দেশের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিদ্যমান বন্দরগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর হলেও আমদানী রপ্তানীর প্রত্যাশিত গতি অর্জন করতে সক্ষম হবে না। ভৌগলিক অবস্থান, সরলরৈখিক ও প্রশস্ত চ্যানেল, বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দেশের মধ্য- দক্ষিণাঞ্চলে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার লক্ষো পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর হিসেবে পায়রা বন্দর প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বন্দরটিকে আধুনিক ও কার্যকর করে গড়ে তুলতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান HR Wallingford এর মাধ্যমে একটি Feasibility Study সম্পন্ন করা হয়। এই গবেষণার ভিত্তিতে পায়রা বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমকে ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টে বিভক্ত করে প্রতিটি কম্পোনেন্ট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট ছিল ‘Conservancy and Port Management’। এর আওতায় বন্দর প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ‘Development of Infrastructure Support Facilities (DISF)’ নামক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। DISF প্রকল্পের একটি মূল উপাদান হলো ‘পায়রা বন্দরের ডিটেইল মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন। একটি সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাস্টারপ্ল্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি কেবল একটি অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নয়, বরং একটি সমন্বিত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রূপরেখা, যা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, পরিবেশগত প্রভাব, ভবিষ্যৎ চাহিদা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার নির্দেশনা প্রদান করে।

মাস্টারপ্ল্যানে বন্দরের সম্ভাব্য বিস্তৃতি, জেটি, টার্মিনাল, কনটেইনার ইয়ার্ড, প্রশাসনিক ভবন, ওয়্যারহাউজ ইত্যাদি স্থাপন সংক্রান্ত পরিকল্পনার পাশাপাশি ট্রাফিক ফোরকাস্টিং স্টাডির মাধ্যমে পণ্য চলাচলের পূর্বাভাস, চ্যানেলের অবস্থা, সিলটেশন হার, ড্রেজিংয়ের পরিমাণ ও ধরণ ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি, সড়ক, রেল এবং টেলিকমিউনিকেশনসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সংযোগের রূপরেখাও মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পরিবেশগত ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিতে মাস্টারপ্ল্যানে EIA (Environmental Impact Assessment) ও SIA (Social Impact Assessment) এর মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রতিকারমূলক সুপারিশ প্রদান করা হয়। ফলে মাস্টারপ্ল্যানটি কেবল প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, পরিবেশগত ও সামাজিক দিক থেকেও একটি সুরক্ষিত ও দায়িত্বশীল উন্নয়ন কাঠামোর পথ প্রদর্শক। সাধারণত, মাস্টারপ্ল্যান একটি বন্দরের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করে দেয়, যা বন্দর সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সন্ধান, এবং বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারের অনুমোদনক্রমে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ আরিখে Bangladesh University of Engineering and Technology (BUET) এই অধীনস্থ BRTC এর সাথে ‘Consultancy Services on Preparation of Payra Port Master Plan’ শীর্ষক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী পায়রা বন্দরের মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজটি ৮টি ধাপে সম্পন্ন করে ২৮টি ডেলিভারেবল জমা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পে BRTC-BUET ও Royal MaskoningOHV-এর শতাধিক বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেন এবং তাদের দীর্ঘ পরিশ্রমে একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করা সম্ভব পায়রা বন্দরের সুবিধাসমূহ আধুনিক ইক্যুইপমেন্ট সমৃদ্ধ ৬৫০ মিটার জেটি সুবিধা। ৩.২৫,০০০ বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড সুবিধা। ১০,০০০ বর্গমিটার আধুনিক সিএফএস সুবিধা। সুপ্রশস্ত ও সরলরৈখিক চ্যানেলে নিরাপদ নেভিগেশন সুবিধা। ২২৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট প্যানামেক্স আকৃতির জাহাজ চলাচলের (৪০,০০০-৫০,০০০ মে. টন কার্গো। ৩০০০-৩৫০০ টিইউএস কপ্টেইনার) সুবিধা। জটবিহীন বার্থিং আন-বার্থিং সুবিধা। অগ্নি নির্বাপন ও দুর্ঘটনা মোকাবেলা সেবা। ইনার চ্যানেলে একই সময়ে ১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা। সময় ও বায় সাশ্রয়ী ক্লাস ১ নদী পথে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সংযোগ সুবিধা (প্রায় ৫ মি. নাব্যতা ও জোয়ার ভাটার অপেক্ষা ছাড়া)। কন্টিনজেন্সি এ্যাংকোরেজ সুবিধা। সুবিশাল ও সুপ্রশস্ত আধুনিক কার পার্কিং শেড সুবিধা।