মাইনুদ্দিন আল আতিক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী):
চার বছর ধরে সন্তানের মতো লালন-পালন। প্রতিদিনের যত্ন, বিশেষ খাবার, নিয়মিত পরিচর্যা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুটি বিশালাকৃতির ষাঁড়, ‘ভয়ংকর’ ও ‘বাদশা বাবু’। কিন্তু ঈদুল আজহার সবচেয়ে বড় আশা নিয়েও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েই ঢাকার পশুর হাট থেকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে খামারি ইব্রাহিম হাওলাদারকে।
পটুয়াখালীর মহিপুর থানা সদর ইউনিয়নের নিজ শিববাড়িয়া গ্রামের গাববাড়িয়া স্লুইসগেটসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা তার খামারে এখন ঈদের আনন্দের বদলে নেমে এসেছে বিষণ্ণতা।
খামার সূত্রে জানা গেছে, ফ্রিজিয়ান জাতের প্রায় ১৮ মণ ওজনের ‘ভয়ংকর’-এর দাম চাওয়া হয়েছিল ৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে শাহিওয়াল জাতের প্রায় ১৭ মণ ওজনের ‘বাদশা বাবু’-এর মূল্য ধরা হয়েছিল ৭ লাখ টাকা। দুইটি মিলিয়ে মোট দাম চাওয়া হয় ১৬ লাখ টাকা।
খামারি ইব্রাহিম হাওলাদার জানান, চার বছরে শুধু খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। ভালো দামের আশায় ধার-দেনা করে গরু দুটি ট্রাকে করে ঢাকার হাটে নেওয়া হলেও সেখানে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা মেলেনি।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘গরু দুটিকে আমরা পরিবারের সদস্যের মতো বড় করেছি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার—ভুট্টার সাইলেস, কাঁচা ঘাস, খড় ও ভুষি খাইয়ে লালন করেছি। কিন্তু বাজারে যে দাম বলা হয়েছে, তাতে মূলধনই উঠত না। তাই লোকসান মেনে বিক্রি না করে আবার খামারে ফিরিয়ে এনেছি।’
খামারের কর্মচারী সোলায়মান খান বলেন, ‘দিন-রাত পরিশ্রম করে গরু দুটিকে বড় করেছি। নিয়মিত গোসল, পরিচর্যা, খাবার—সবকিছুর পেছনে অনেক শ্রম গেছে। এখন মনে হচ্ছে পুরো পরিশ্রমটাই যেন বৃথা।’
ঢাকা থেকে বিশাল আকৃতির ষাঁড় দুটি ফেরত এসেছে—এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই আজ সকাল থেকে স্থানীয় মানুষের ভিড় বাড়ছে খামারে। অনেকে গরু দুটির সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ খামারির দুর্দশায় সহানুভূতি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব সরদার ও সাইদুর রহমান বলেন, ‘গরু দুটি আমাদের এলাকার গর্ব। খামারি ইব্রাহিম অনেক কষ্ট করেছেন। কিন্তু বাজার পরিস্থিতির কারণে তিনি ন্যায্য দাম পেলেন না, এটা খুবই কষ্টের।’
গরু দুটির তদারকিতে থাকা পশু চিকিৎসক আহসান হাবিব জানান, ‘ষাঁড় দুটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও প্রাকৃতিক উপায়ে লালিত। তবে এ বছর বড় গরুর বাজার কিছুটা মন্দা। সেই কারণে হয়তো কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া যায়নি।’
দেশজুড়ে যখন কুরবানির আনন্দ, তখন মহিপুরের এই প্রান্তিক খামারির চোখে এখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। ধার-দেনার চাপ আর বিশালাকৃতির দুই ষাঁড়ের ভরণপোষণের চিন্তাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার কাছে।









